অফিসের সময় মাসিক!

অফিসের সময় মাসিক!

ধরুন আজ আপনার জীবনের বিশেষ একটা দিন। অনেকদিন থেকেই এই দিনটির জন্য আপনি অপেক্ষা করছিলেন। গুরুত্বপূর্ন একটা মিটিং এ প্রেজেন্টেশন দেবেন অফিসের বসদের সামনে। বিশাল কনফারেন্স রুমে সবাই চুপচাপ তাকিয়ে আছে আপনার দিকে। এমনিতেই খুব টেনশন হচ্ছে। প্রেজেন্টেশন শুরু করতে যাবেন, ঠিক সে সময় তলপেটে চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করলেন। আর এর কিছুক্ষণ পরই বুঝতে পারলেন যে আপনার মাসিক হয়েছে। কোন মতে প্রেজেন্টেশন শেষ করেই, ছুটলেন টয়লেটের দিকে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বের হওয়ার কারনে, সাথে কোন প্যাড বা ট্যাম্পুন নেই। কি করবেন বুঝতে পারছেন না। অফিসের অন্য মেয়েদেরকেও ও দেখতে পেলেন না আশেপাশে। এখন কাউকে যে প্যাড আনতে বলবেন, তেমন পরিস্থিতিও নেই। যদি ছেলেদের বললে হাসাহাসি করে বা অস্বস্তি বোধ করে। তাই প্রচন্ড বিরক্তি  নিয়ে নিজেই ছুটলেন প্যাড কিনতে। ছুটছেন আর মনে হচ্ছে, আমি হয়তো পিছিয়ে পড়ছি অন্যদের থেকে?

পাইলট, ক্যাশিয়ার, পোশাক শ্রমিক, ডাক্তার, সাংবাদিক কিংবা খেলোয়াড় কর্মজীবি প্রায় সব মেয়েই কখনো না কখনো মুখোমুখি হন এরকম পরিস্থিতির। হয়তো বিষয়টি তাদের কাজের ক্ষেত্রে তেমন ক্ষতি করে না কিন্তু মাসিক বিষয়টি কর্মজীবি মহিলাদের জন্য অনেক সময়ই বিব্রতকর একটি পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। যদি কাজের স্থান মাসিকবান্ধব না হয়। দিনের বেশিভাগ সময়ই অফিসে কাটাতে হয়, এছাড়া অনেক মেয়েই কাজ করেন অফিস আওয়ারের বাইরেও তাই অফিসে মাসিকবান্ধব পরিবেশ থাকা অত্যন্ত জরুরী।

মাসিক নিয়ে এক ধরনের কুসংস্কার ও লজ্জা কাজ করে সবার মধ্যে। কাছের মানুষ ছাড়া, প্যাড কেনা বা মাসিকের বিষয়টি যেমন সবাইকে বলতে পারে না মেয়েরা, তেমনি সব ছেলেরা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতেও পারে না। মাসিক হয়েছে এটা জানতে পারলে ছেলে সহকর্মীরা সামনাসামনি কথা না বললেও হয়তো আড়ালে হাসাহাসি করবে এই ভয়টা কাজ করে অনেক মেয়ের মধ্যে। বিষয়টা শেয়ার করলে অসুস্থতা হিসেবেও ট্রিট করে অনেকেই। তাই কারো সাথে শেয়ার করার আগে বেশ কয়েকবার ভাবে মেয়েরা। কি বলবে, কিভাবে বলবে?

২০১৭ সালে জর্জিয়াতে এক মহিলাকে তার চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় মাসিকের রক্ত চেয়ারে লাগানোর কারণে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন এখন বিষয়টি নিয়ে আদালতে লড়ছেন। এটাকে তারা এক ধরনের যৌন হয়রানি এবং লিঙ্গ বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

তবে এর বাইরে, পরিবর্তনের গল্পও কিন্তু কম নয়। অনেক পুরুষ সহকর্মীই নিজে থেকে এগিয়ে আসছেন মাসিকের সময় তাদের নারী সহকর্মীদের সাহায্য করতে। আবার অনেক মেয়েরা সচেতনতা বৃদ্ধিতে ও পুরুষদের সংবেদনশীল আচরনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। যাতে মাসিকের সময়, কাজের জায়গা তাদের জন্য নিরাপদ ও বন্ধুত্বপূর্ন হয়। মেয়েদেরকেই বলতে শিখতে হবে, মাসিক নিয়ে কোন লজ্জা নয়। ‘ফ্রি ব্লিডস প্রাউডলি’ এই মেসেজ নিয়ে ২০১৫ সালে ২৬ বছর বয়সী কিরান গান্ধী যোগ দেন ম্যারাথনে। সে সময় তার মাসিক চলছিলো এবং তিনি কোন প্যাড ব্যবহার করেননি। বিষয়টি সমালোচনা এবং প্রশংসা দুইই পায়। তবে মাসিক নিয়ে লজ্জা পাবার কিছু নেই, বিষয়টি নিয়ে কথা বলা উচিত খোলাখুলিভাবে এই মেসেজটি তিনি ঠিকভাবেই ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন সবার মাঝে।

মাসিক কোন অসুখ নয়, দূর্বলতা নয় এমনকি আড়ালে খুব বেশি আলোচনা করার মতো বিষয়ও নয় এটি এমন মেসেজ কর্মক্ষেত্রে পৌঁছানো খুব জরুরি। আর এই বিষয়ে সবচেয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেন পুরুষরা। অফিসে মাসিকবান্ধব টয়লেট তৈরি করার পাশাপাশি, মাসিকের সময় যেকোন সহযোগীতায় মেয়েদের পাশে এসে দাঁড়াতে পারেন তারা। আর মাসিক বা প্যাড নিয়ে ট্যাবু ভেঙ্গে এগোতে হবে সবাইকেই। প্যাডগুলো আড়ালে না রেখে টয়লেট টিস্যুর মতো রেস্ট-রুমগুলোতে রাখলে তা মেয়েদের নাগালের মধ্যে থাকবে। এছাড়া, মেয়েদের জন্য অফিসগুলোতে বিনামূল্যে প্যাডের ব্যবস্থা করাটা খুব দরকার, দরকার উইম্যান ফ্রেন্ডলি পলিসির। এটা খুবই সাধারন একটা কাজ, যা নাটকীয়ভাবে বাড়াতে পারে নারী-কর্মীদের কর্মস্পৃহা।

 

তথ্যসূত্র: https://www.marieclaire.com/politics/a12832430/workplace-menstrual-equity/

কমেন্ট করুন

আপনার ইমেইল অ্যাড্রেসটি প্রকাশ করা হবে না