ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের বয়ঃসন্ধি ও মাসিক । বেড়ে ওঠার আনন্দ নাকি মাসিক হওয়ার আতংক

মাত্র নয় বছর বয়সে পোলিও তাঁকে হুইলচেয়ারে আটকে ফেলে। স্কুলেও যাওয়া হয়নি। তাঁর বয়সী অন্যান্য কিশোরী মেয়েরা যখন একে অপরের সাথে গল্পে আর কথায় বেড়ে ওঠার নানান বিষয়গুলো একসাথে জানছে, তখন সালমার একাকী সময় কাটছিল ঘরের চার দেয়ালে।

সেদিনের সেই কিশোরী সালমাকে আজকের সালমা মাহবুব হতে পার করতে হয়েছে অনেক চড়াই উৎড়াই। জীবনের এক পর্যায়ে এসে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এন্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান), যেখানে তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সাথে প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এর সাধারণ সম্পাদকও তিনি। জানতে চেয়েছিলাম তাঁর বয়ঃসন্ধি ও মাসিকের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে।

প্রকৃতির নিয়মেই বয়ঃসন্ধিকালে মাসিকের সাথে পরিচয় হয় তাঁর। আর দশটা পরিবারের মত সালমার পরিবারেও মাসিক নিয়ে খোলামেলাভাবে কথা বলার চর্চা ছিল না। তাই এ বিষয়ে পরিবারের কাছ থেকে জানা হয়নি। শৈশবের সেই দিনগুলো স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সালমা বলেন, “মায়ের মাসিক হতো, সেখানেও ছিল গোপনীয়তা। প্রতিমাসে অনেক তুলা লাগতো, আমি অবাক হতাম, এত তুলা কোথায় যায়!”

সালমার এই বিস্ময় সেদিন ভাঙে যেদিন তাঁর প্রথম মাসিক হয়। “প্রথম যখন পিরিয়ড হয়, আমি তো বুঝিইনি। আমার মা আমাকে বাথরুমে নিয়ে যান। এরপরে আমাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়, এখন আমি বড় হয়ে গেছি।” এভাবেই প্রথম মাসিকের দিনটির কথা বলেন সালমা।

মাসিক হওয়ার পর এই যে ‘বড়’ হয়ে যাওয়া এ যেন রীতিমত এক আতংক! সালমার মনের মধ্যে ভয় ঢুকে যায় যে, আগের মত সব হয়ত তিনি করতে পারবেন না। এ যেন আরেক বাধা! যেখানে টয়লেটের হাই কমড নিজে ব্যবহার করতে পারতেন না সেখানে মাসিক যেন আরও উটকো যন্ত্রনা। সালমার ভাষায়, “মাসিকের সময় অসহ্য লাগতো, মনে হতো বন্ধ হয়ে গেলেই ভালো হতো। তাহলে আর কাউকে এত কষ্ট দিতে হতো না।”

সেই মুহূর্তগুলোতে সবচেয়ে বেশি যিনি সাহায্য করেছেন তিনি ছিলেন সালমার মা। স্পেশাল চেয়ার কমডে কোলে করে তাকে নিয়ে যেতে, বসাতে, মাসিকের প্যাড পরিবর্তনে সাহায্য করতো তাঁর মা। এরপর চেয়ার সংস্করণ করে নিজে ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন কিন্তু শুরুর দিনগুলোতে সালমার মাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। সালমা ভাবেন যে, যেসব প্রতিবন্ধীদের মা নেই তাদের না জানি কী দুঃসহ অবস্থা!

সালমা জানান রিসার্চ থেকে জানা যায় যে, অনেক প্রতিবন্ধীদের মাসিক বন্ধ করে দেয়ার প্রবনতা থাকে। ইউটেরাস ফেলে দিলে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু ছোটবেলা থেকে প্রতিবন্ধী মেয়েকে বোঝানো হয় যে তার বিয়ে হবে না সুতরাং মাসিক হয়ে লাভ কী! কিন্তু সালমা মনে করেন সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের মাসিকের দিনগুলো সহজ করতে সালমা দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেয়ারগিভার দরকার বলে মনে করেন। সেই সাথে পরিবার কিভাবে তাকে মাসিকের বিষয়ে জানাবেন সে বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। “মাসিকের আগে এ সম্পর্কে ধারণা দেয়ার বিষয়ে মা-বাবাকে ট্রেনিং দেয়া দরকার যা থেকে তারা শিখবে যে, প্রতিবন্ধী সন্তানকে কিভাবে আগে থেকে জানাবে যাতে সে প্রস্তুত থাকে। যেমন: বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়েকে জানানো, তাকে তৈরি করা যাতে যে ভয় না পায়। সে কিভাবে মাসিক ব্যবস্থাপনা করবে এ বিষয়ে ধৈর্য্য সহকারে প্রশিক্ষণ দেয়া। বাইরের দেশে দেখা যায় যে, তারা প্রতিবন্ধী মানুষদের এরকম ব্যবস্থা বা সুবিধা দিচ্ছে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়েরা বার বার বিষয়গুলো বললে বুঝতে পারে।এর পাশাপাশি মায়েদের সাহায্যের জন্য কেয়ারগিভার দরকার। বি-স্ক্যান থেকে জোর দিচ্ছি কেয়ারগিভারের ট্রেনিং-এর ওপর।”

এর সাথে তিনি আরও যুক্ত করে বলেন, “সরকারী পর্যায়ে কেয়ারগিভারদের প্রশিক্ষণের কিছু কার্যক্রম আছে তবে কেয়ারগিভারের ট্রেনিং নিলেও শেষ পর্যন্ত সার্ভিসটা নিশ্চিত হয় না। প্রতিবন্ধী মানুষের সাহায্যের জন্য যে ধরণের প্রশিক্ষণ কেয়ারগিভারের দরকার সেভাবে উদ্যোগটা এখনও নেয়া হয়নি।”

ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত দুই বছর ধরে কাজ করছে বি-স্ক্যান। এখানে মেইনস্ট্রীম সংগঠনগুলো প্রতিবন্ধী মানুষদের সাথে একসাথে অংশ নিচ্ছে। প্রতিবন্ধী নারীদের মাসিকের বিষয়ে তেমন কোন সেমিনার আগে দেখা যায় নি। তাই প্রথম বছরে প্রতিবন্ধী নারীদের পাশাপাশি অন্যান্যদের মাসিকের সময় কী কী অসুবিধার সম্মুক্ষীণ হতে হয় সে বিষয়গুলো শেয়ারের মাধ্যমে আয়োজনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। এর পরের বছর মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সাথে নিয়ে ওয়াটার এইড, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশান, ওয়াশ এলায়েন্সসহ ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে সাথে নিয়ে একটা ন্যাশনাল সেমিনার করে বি-স্ক্যান। আরও বড় পরিসরে কাজ করা, প্রতিবন্ধী মানুষের মাসিকের সময় নানান সমস্যার বিষয়ে সার্ভে করাসহ আরো অনেক উদ্যোগের কথা বলেন সালমা। এর ফলে সরকারী পর্যায় থেকে ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের বিষয়ে যে আরও অনেক করা দরকার সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে বলে তাঁর বিশ্বাস।

ভিন্নভাবে সক্ষম জন্য টয়লেট নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যেই অনেকগুলো উদ্যোগের কথা জানান সালমা। তার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি উদ্যোগের কথা উল্লেক্ষ করে বলেন, “ডিপার্টমেন্ট অব উইমেন অ্যাফেয়ার্স-এ ভিন্নভাবে সক্ষম নারীদের জন্য টয়লেট ছিল না, সেখানে টয়লেট বসানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিজেদের প্রচেষ্টায় ডিজি-এর সাথে আলাপ করে বুয়েটের স্থপতি এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্য নিয়ে ডিজাইন দিয়েছি, টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছি, ৫ম তলায় একটি টয়লেট হয়েছে। জাতীয় জাদঘরে প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটের ব্যবস্থা করেছি। আর কিছুদিন আগেই শেষ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরটা। আর্টস ফ্যাকাল্টিতে একটা ছেলেদের ও একটা মেয়েদের; দুইটা টয়লেটের কাজ শেষ হল।”

ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলতে গিয়ে সালমা বলেন, “ঘরের বাইরে যাওয়ার বাধা, শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া, বিয়ে দিলেও বেশিরভাগক্ষেত্রে নির্যাতিত হওয়া, পরিবার থেকে মেয়েদের বিয়ের কথা চিন্তা না করা, সাপোর্টের জায়গাটা কম, ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো দোতলা, তারা সেখানে গিয়ে সাপোর্ট নিতে পারে না। ট্রান্সপোর্টে সে যেতে পারে না, সিএনজিতে উঠতে পারবে না, বাসে উঠতে পারবে না। যাবে কিভাবে? এর মধ্যে মাসিক হলে তারা স্কুলে আসতে চায় না, টয়লেট ময়লা বলে টয়লেট চেপে রাখে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় হাইজিন, সাপ্লাই পানি, মাসিকবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।”

সালমা মনে করেন ভিন্নভাবে সক্ষম মেয়েদের নিজেদের অধিকার নিজেদের বুঝে নিতে হবে। তাদের এগিয়ে আসতে হবে এবং পরিবার, সমাজ, সরকার সবার তাকে সমর্থন দিতে হবে ও সাহায্য করতে হবে। তাহলেই প্রতিবন্ধী মেয়েদের বেড়ে ওঠার দিনগুলো হবে আত্মবিশ্বাসের ও স্বাচ্ছন্দ্যের।

কমেন্ট করুন

আপনার ইমেইল অ্যাড্রেসটি প্রকাশ করা হবে না