পথেঘাটে হঠাৎ অস্বস্তি!!

পথেঘাটে হঠাৎ অস্বস্তি!!

আজ শীলার খুব আনন্দের দিন। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ, স্কুলও ছুটি দিয়েছে অনেকদিনের জন্য। সবাই মিলে আজ তাই ছুটি কাটাতে দাদাবাড়ি যাচ্ছে। শীলার বাবা অবশ্য যাচ্ছেন না ওদের সাথে। শীলাকে, ওর মাকে আর পিচ্চি সুপ্তকে বাসে উঠিয়ে দিয়েই চলে আসবেন তিনি। শীলার দাদা বাড়ী রংপুরে। ঢাকা থেকে বাসে যেতে লাগে ৮-৯ ঘণ্টা। সকাল ১০টায় বাস। কাল রাত থেকেই ব্যাগ গুছিয়ে শীলা মনে মনে তৈরি হয়ে বসে আছে। কিন্তু যেই বাড়ি থেকে বের হবে, অমনি বুঝলো মাসিক হবে আজ। যদিও তারিখ নয় আজকে, তবে জার্নির কারণে এরকম তারিখ দুই একদিন এগিয়ে যায় কিংবা পেছায় সেটা কোন ব্যাপার না। ওর সাথে সবসময় এরকম হয়, যখনই কোথাও ঘুরতে যাবে কিংবা মজা করতে চাইবে ঠিক তখনি শুরু এই অস্বস্তির!    

বাসায় থাকা অবস্থায় এমনকি স্কুলে গিয়েও মাসিক হলে একদমই খারাপ লাগে না ওর। কারণ বাড়ি ও স্কুল সব জায়গাতেই আছে মাসিকবান্ধব টয়লেট। কিন্তু মাসিক নিয়ে রাস্তায় বের হতে কিংবা দূরের জার্নি করতে গেলেই ছোট-খাটো সমস্যায় পড়তে হয়। পাবলিক টয়লেটগুলোর অবস্থা এতোটাই খারাপ যে সেগুলোতে যেতেই ইচ্ছা করে না ওর। যতোবারই দাদা বাড়ি গেছে, বাসস্ট্যান্ডের টয়লেটগুলোতে যেতে হলে মা কিংবা বাবাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে, মুখে কাপড় বেঁধে যেতে হয়েছে। তাও গন্ধে বমি চলে আসতো ওর। আর মাসিকের সময়তো যাবার প্রশ্নই আসে না। এসব ভেবে খুব মন খারাপ হয়ে গেলো শীলার।

কিন্তু, কিছুই করার নাই। যাওয়ার সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন আর কোনভাবেই জার্নির তারিখ পেছানো যাবে না। বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার সময়, মুখ কালো করে সোফার উপর চুপচাপ বসে ছিলো শীলা। মা বারবার তাড়া দিচ্ছে তাড়াতাড়ি কর, বাস মিস হয়ে যাবে তো! ওর মন খারাপ দেখে বাবা কাছে এসে জানতে চাইলো, কি হয়েছে? যেতে ইচ্ছা করছে না? শীলা কিছুই না বলে চুপচাপ সবার সাথে বের হলো বাসা থেকে। আর মনে মনে হিসাব মিলাতে থাকলো, ৯-১০ ঘণ্টা কি করে টয়লেট ব্যবহার না করে কাটানো যাবে। একটা সমাধান বের করে মনটা একটু হাল্কা হলো ওর- কম করে পানি খেলেই তো হবে, তাহলেই আর টয়লেটে যাবার দরকার হবে না!

এই সমস্যা শুধু শীলার একার নয়। এই সমস্যা বাংলাদেশের প্রায় সব মেয়েরই। কেবল মাসিকের সময়ই নয়, বাড়ির বাইরে বের হলেই টয়লেট ব্যবহার করা নিয়ে একটা ভয়াবহ সমস্যায় পড়ে যায় তারা। দূর পাল্লার ভ্রমণ ছাড়াও ঢাকা শহরের জ্যামে বসে থাকতে থাকতেও অনেকের টয়লেট ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাবলিক টয়লেটগুলোতে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকায় এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও গোপনীয়তার অভাবে মেয়েরা সেগুলো ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। শুধু মেয়েদের জন্যই নয়, যে কারো কাছেই পাবলিক টয়লেট ব্যবহার ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অব্যবস্থাপনার জন্য। দূরপাল্লার ভ্রমণের সময় বাসস্ট্যান্ডগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু যথাযথ পরিচ্ছন্নতার অভাবে বাসস্ট্যান্ডের টয়লেটগুলো অনেকেই ব্যবহার করতে পারে না।

এই সমস্যার সমাধানে সরকার ও ওয়াটার এইড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ২৮টি আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। টয়লেটগুলো ঢাকার কোন কোন স্থানে অবস্থিত তা জনগণ যাতে সহজেই জানতে পারে, সেজন্য ওয়াটার এইড বাংলাদেশ একটি মোবাইল অ্যাপও তৈরি করেছে। অ্যাপটির লিঙ্কঃ https://goo.gl/f9AA3F । (সূত্রঃ ওয়াটার এইড, বাংলাদেশ)।তবে এই সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। কোন কোন স্থানে পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, আগে সেটা চিহ্নিত করতে হবে। যেমন- বাস স্ট্যান্ড, বিমান বন্দর, রেল স্টেশন, পার্ক এবং লোকাল বাসগুলো যেখানে যেখানে থামে সেসব জায়গায় পাব্লিক টয়লেট নির্মাণের বিষয়ে নজর দিতে হবে।

বর্তমানে, পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা দেয়ার জন্য পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও অফিস ও অন্যান্য কাজে বাড়ির বাইরে থাকছেন দিনের বেশিরভাগ সময়ই। অথচ দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা অনেক কম। যা আছে সেগুলো মেয়েদের ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় মেয়েরা ভ্রমণের সময় বা বাড়ির বাইরে থাকলে প্রায় সময়ই টয়লেট ব্যবহার করে না কিংবা কম পানি খায়। আর এর ফলে পানিশূন্যতা, জরায়ু ও কিডনির সমস্যাসহ নানা রকম শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। মাসিককালীন এই অব্যবস্থাপনা, ঝুঁকির মাত্রা আরো বাড়ায়। অনেক্ষণ ধরে একই প্যাড বা কাপড় ব্যবহার করলে তা থেকে ইনফেকশন হতে পারে, সে কারণে ৪-৫ ঘণ্টা পরপর ব্যবহৃত প্যাড বা কাপড় পরিবর্তন করতে হয়, ব্যবহৃত কাপড় বা প্যাড কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে ঢাকনাসহ ঝুড়িতে ফেলতে হয়। এছাড়া পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয়। এসব ব্যবস্থা না থাকলে মেয়েরা ভোগান্তিতে পড়ে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম তার এক গবেষণায় দেখান, শুধু চলতি পথেই নয়; রাস্তায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশের নারী সদস্যদেরও টয়লেটের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বা কাজের সময় তারাও এ নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়।

মাসিককালীন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের বিষয়ে মেয়েরা নিজেরাই স্বউদ্যোগে সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। সাধারণত বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে, ব্যাগে প্যাড বা টিস্যু নিয়েই বের হয়। তবে যতদিন পাবলিক টয়লেটের সমস্যা সমাধান হচ্ছে না, ততদিন দূরে কোথাও যাবার আগে মেয়েদের কিছু সতর্কতা থাকা জরুরি, যেমন সম্ভব হলে মাসিকের তারিখ দেখে কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করা, পেট ব্যথা হলে সাথে ওষুধ রাখা, সমস্যায় পড়লে বন্ধু বা আত্মীয় কারো সাথে শেয়ার করে সহায়তা চাওয়া ইত্যাদি। তাছাড়া, যেখানে যাচ্ছেন সেখানে মাসিক ব্যবস্থাপনায় কী কী পাওয়া যাবে সে ব্যাপারে একটু খবর রাখুন। প্যাড, পরিস্কার কাপড় বা ট্যাম্পুন, প্ল্যাস্টিক ব্যাগ, হট ওয়াটার ব্যাগ ইত্যাদি সাথে রাখুন। তবে সবসময় এসব খেয়াল রাখা সবার জন্য সম্ভব হয় না। তাই, সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে, যাতে আমরা সবাই মিলে মেয়েদেরকে একটি সুস্থ্ ও নিরাপদ জীবন দিতে পারি। সবার আন্তরিক সচেতনতায় ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা আনতে পারি সুন্দর ভবিষ্যৎ।

কমেন্ট করুন

আপনার ইমেইল অ্যাড্রেসটি প্রকাশ করা হবে না