সবার জন্য হোক মাসিকবান্ধব টয়লেটের সুব্যবস্থা

সবার জন্য হোক মাসিকবান্ধব টয়লেটের সুব্যবস্থা

আজ লুনার মনটা ভীষণ খারাপ। অথচ আজ ওর খুশি হবার কথা ছিলো! আজ ওদের মেয়ে আলো, নতুন এক জীবনে প্রবেশ করলো। আলোকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে ডাইরির পাতায় লাল কালিতে দিনটা লিখে রাখলো লুনা- আলোর আজ প্রথম মাসিক হলো। মেয়ের মাসিক হওয়ায় লুনার মন খারাপ হবার কারণ আছে, আলো আর দশটা মানুষের মতো স্বাভাবিক না। ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় ও, বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর ডাক্তার জানালো সুস্থ হলেও হয়তো কোনদিন আর হাঁটতে পারবে না আলো, এমনকি ডান হাতটাও কম নাড়া-চাড়া করতে পারবে। তখন বয়স ছিলো মাত্র চার বছর। এতোগুলো বছর হুইলচেয়ার আর মা-বাবার হাত ধরেই সব কাজ করেছে ও। খাওয়া, গোসল এমনকি একা একা ঘুমাতেও পারে না মেয়েটা। আলোর জীবনের অনেক কিছুই এখন আর স্বাভাবিক নয়, অথচ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বয়ঃসন্ধির সাথে সাথে মাসিক ঠিকই হয়েছে।

লুনা যখন বাসায় থাকে না, তখন আলোকে দেখার জন্য একজন মানুষ আছে, কিন্তু সে মাসিকের বিষয়ে সচেতন নয়। প্রতিমাসে তিন-চার দিন কীভাবে কী করবে ও! এটা নিয়েই দুশ্চিন্তা হচ্ছে লুনার। বিষয়টা হাসানের সাথে শেয়ার করলো ও। হাসান ওকে আস্বস্ত করলো যাতে বিষয়টা নিয়ে বেশি চিন্তা না করে। বাসার টয়লেটটা আলোর ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু লুনার দুশ্চিন্তা তবুও কাটলো না। আলোদের স্কুলে টয়লেট ব্যবহারে সাহায্য করার লোক আছে, কিন্তু সব সময় তাদেরকে পাওয়া যায় না। একদিন ও বলছিলো বেসিনটা অনেক উঁচুতে, হাত ধুতে গেলে সমস্যা হয়। এরকম অবস্থায় মাসিকের দিনগুলোতে স্কুলে না যাওয়া বা বাইরে না যাওয়া কোন সমাধান নয়; বরং স্কুলের হেডস্যারের সাথে কথা বলতে হবে যাতে ওদের জন্য একটা ব্যবহার উপযোগী টয়লেটের ব্যবস্থা করে।

এদিকে, ছোটবেলায় পোলিওতে দুই পা আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই ক্র্যাচ ও হুইল চেয়ার ছাড়া হাঁটা-চলা করতে পারে না সোনিয়া। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনে কোনভাবেই বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে সে এখন একজন চাকরিজীবী। বাড়ির কাছেই বাচ্চাদের একটা স্কুলে পড়ায়। যেহেতু সে ভিন্নভাবে সক্ষম একজন মানুষ, তাই  বাড়ি-অফিস-বাড়ি, এই পথে প্রতিদিনই কিছু না কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে। তবে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি ওকে কষ্ট দেয়, সেটা হলো টয়লেট ব্যবহার। বাড়িতে থাকলে মা বা বোন কেউ না কেউ তাকে সাহায্য করে এ ব্যাপারে, এমনকি তার সুবিধার জন্য কমোডটাও বানানো হয়েছে উঁচু করে। কিন্তু কাজে বের হলেই টয়লেটে যাওয়া নিয়ে বাধে বিপত্তি। সবাই সাহায্য করে বা করতে চায় তবে, সবার কাছে সব সময় সাহায্য নেওয়া যায় না। আর মাসিক হলে তো সেই বিপত্তিটা বেড়ে দ্বিগুণ হয়!

এসব নিয়ে মন খারাপ করলে, উলটো মা বলেন- কাজ করার কী দরকার? বাড়িতে বসে থাকলেই তো হয়। মাঝে মাঝে কান্না পায় সোনিয়ার, ভিন্নভাবে সক্ষম বলে কি ওর কোন স্বাধীনতা নেই? বাড়ির লোকগুলো যেভাবে ওকে সাহায্য করে ওভাবে বাইরের সবাইও যদি একটু ভাবতো আমাদের কথা, টয়লেটগুলো যদি ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের জন্য বিশেষভাবে নির্মাণ করতো, তাহলে আর এতো সমস্যায় পড়তে হতো না।  প্রতিদিন এসব ভাবতে ভাবতেই অফিসে যায় সোনিয়া। শুধু অফিস কেনো, মার্কেট, স্কুল-কলেজ, সরকারি-বেসরকারি কোন অফিসেই ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের কথা ভেবে টয়লেট তৈরি করা হয় না। যা তাদের চলাচল ও কাজের ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব মতে, দেশে ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৭২ লক্ষ ৪ হাজার ৬৫৯ জন। যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৩৬ লক্ষ ৭ হাজার ১৭৪ জন। নারীর সংখ্যা ৩৫ লক্ষ ৯৭ হাজার ৪৮৫ জন (DISABILITY IN BANGLADESH: PREVALENCE AND PATTERN, Population Monograph: Volume-5) । এই হিসাব অনুযায়ী ভিন্নভাবে সক্ষম মোট জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ নারী, যারা প্রতিনিয়ত ঘরে এবং বাইরে নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জেরে প্রায় সময়ই বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হয় না তাদেরকে, চার দেয়ালের মধ্যে দিন কাটায় অনেকেই। ফলে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত হয় তারা। এমনকি বিয়ের ব্যবস্থা করতেও পরিবার কিছুটা দোটানায় ভোগেন। অনেকক্ষেত্রে বিয়ে হলেও শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হয়। এসব ব্যাপারে ছেলে-মেয়ে কারো জন্যই বিশেষ কোন ভিক্টিম সাপোর্ট এর ব্যবস্থা নেই, থাকলেও ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারগুলোর সিঁড়ি ভেঙে উঠতে পারে না অনেকেই। ফলে পাবলিক প্লেস, পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলোতে ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের প্রবেশের অনুকূল পরিবেশ খুবই কম। এমতাবস্থায়, মাসিক হলে মেয়েরা অনেক বেশি সমস্যার মধ্যে পড়ে।

মাসিকের দিনগুলোতে, বিশেষ প্রয়োজনে পেশাদার কোন তত্ত্বাবধায়কের সাহায্য পায় না তারা। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রায় সময়ই মা এবং বোন তত্ত্বাবধায়ক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী ভূমিকা পালন করে থাকে, কিন্তু মাসিক ব্যবস্থাপনা করার বিষয়ে তাদের কোন প্রশিক্ষণ নেই, সে কারণে প্রয়োজনে সঠিক সেবাটা পায় না মেয়েরা। মাসিকের সময় পর্যাপ্ত সাহায্য ও সেবা না পাওয়ার কারণে প্রতিবন্ধী মেয়েরা সামাজিক অন্যান্য কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে না। যারা হুইল চেয়ার ব্যবহার করে; তাদের জন্য র‌্যাম্পস, হ্যান্ড রিং না থাকায় তারা পাব্লিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারে না। ফলে, মাসিক হলে দীর্ঘ সময় ধরে তারা টয়লেটে যায় না কিংবা প্যাড/কাপড় বদলায় না, যা অস্বস্তি ও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

অনেক সময় পরিবারও ভিন্নভাবে সক্ষম মেয়ের মাসিক ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে পালন করতে পারেন না। ধরে নেয়া হয় ভিন্নভাবে সক্ষম একজন মেয়ের মা হবার বিষয়টি অনেক ঝামেলার। ফলে তাদের জরায়ু ফেলে দেয়া বা ঋতুস্রাব বন্ধ করে দেবার কথা চিন্তা করে। কিন্তু ভিন্নভাবে সক্ষম অনেকেই স্বামী ও সন্তান নিয়ে সুখী জীবন যাপন করছেন। বর্তমানে, অনেকেই স্কুল, কলেজ, চাকরি ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যোগ দিচ্ছেন। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাই তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ ও সেবার কথা ভাববার সময় হয়েছে।

নিজেদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে যেমন তাদের নিজেদের কথা বলা দরকার, তেমনি পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সরকার সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে তাদের সহযোগিতায়। বাড়ি, কাজের জায়গা, বাসস্ট্যান্ড, পাবলিক প্লেস- সবখানে ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষরা ব্যবহার করতে পারে এমন টয়লেট নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি টয়লেটগুলো হতে হবে মাসিকবান্ধব। তাহলেই, কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়া তারা এগিয়ে যেতে পারবেন সম্ভাবনাময় সফল ও সুখী জীবনের দিকে।

ছবি কৃতজ্ঞতা: সালমা মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক, বি স্ক্যান

কমেন্ট করুন

আপনার ইমেইল অ্যাড্রেসটি প্রকাশ করা হবে না